শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে আগামী দুই মাসের মধ্যে সারা দেশে অন্তত ১,০০০টি খেলার মাঠ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি করে মাঠ স্থাপন এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রতি দুই থেকে তিনটি ওয়ার্ডের জন্য একটি মাঠ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ইউনিয়নভিত্তিক খেলার মাঠ স্থাপন ও ক্রীড়া কার্যক্রম সম্প্রসারণ নিয়ে আয়োজিত এক বৈঠকে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি সুজাউদ্দৌলা সুজন মাহমুদ বৈঠকের সিদ্ধান্তের কথা জানান।

৪ হাজার ৫৯৯ ইউনিয়নে মাঠ তৈরির পরিকল্পনা

বৈঠকে জানানো হয়, দেশের ৪ হাজার ৫৯৯টি ইউনিয়নে পর্যায়ক্রমে খেলার মাঠ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ২৭টি জেলায় মাঠ তৈরির জন্য ৪০৩টি খাসজমি চিহ্নিত করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি মাঠের আয়তন হবে তিন থেকে আট বিঘার মধ্যে। তবে এসব মাঠের কতটি নতুন করে নির্মাণ করা হবে আর কতটি বিদ্যমান জমি উন্নয়ন করে খেলাধুলার উপযোগী করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রধানমন্ত্রী মাঠগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি সারা বছর খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু রাখার নির্দেশ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে।

ঢাকায় ১৩০টি মাঠ প্রস্তুতের পরিকল্পনা

রাজধানীতে মাঠের সংকট কমাতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪০টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯০টি মাঠ খেলাধুলার উপযোগী করে সেখানে নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

নগর এলাকায় খেলার জায়গার অভাবে অনেক শিশু ও কিশোরকে সড়ক, গলির মুখ কিংবা সীমিত জায়গায় খেলতে হয়। মাঠগুলো যথাযথভাবে প্রস্তুত করা গেলে তাদের জন্য নিরাপদে খেলাধুলার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে মাঠের অবস্থান, প্রবেশের সুযোগ, নিরাপত্তা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

১৪ লাখ কিশোর-কিশোরীকে খেলাধুলায় যুক্ত করার লক্ষ্য

ইউনিয়ন পর্যায়ে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল ও ব্যাডমিন্টনসহ ১০টি খেলায় প্রায় ১৪ লাখ কিশোর-কিশোরীকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি উপজেলায় একজন করে ক্রীড়া কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া দেশের ৫০৩টি উপজেলায় একযোগে ক্রীড়া কর্মসূচি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। ৫ নভেম্বর খুলনা থেকে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। একই সঙ্গে উপজেলা স্টেডিয়ামগুলো সচল করা, দখল হয়ে যাওয়া মাঠ উদ্ধার এবং বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত খেলাধুলা ও ক্রীড়া ক্লাবের কার্যক্রম চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলাধুলার গুরুত্ব

শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নিয়মিত খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ। দৌড়ানো, ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার মতো শারীরিক কার্যক্রম শরীরের সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। দলগত খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা সহযোগিতা, শৃঙ্খলা ও অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার অভ্যাসও গড়ে তুলতে পারে।

অন্যদিকে, খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকলে শিশুদের অবসর কাটানোর জায়গা সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহর ও জনবসতিতে খোলা জায়গার অভাব শিশুদের নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রমে বাধা তৈরি করতে পারে।

তাই শুধু মাঠ নির্মাণ নয়, সেখানে নিয়মিত খেলাধুলার আয়োজন, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং শিশুদের নিরাপদ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। মেয়েশিশু ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য মাঠ ব্যবহার সহজ করা গেলে উদ্যোগটির সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে।

মাঠ নির্মাণের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণেও গুরুত্ব

নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মাঠ স্থাপন ও ক্রীড়া কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সুস্থ, সুন্দর ও ক্রীড়াবান্ধব প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

তবে এই পরিকল্পনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে মাঠগুলো প্রস্তুত করা, জমি সংরক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলার কার্যক্রম চালু রাখার ওপর। মাঠ নির্মাণের পর সেগুলো অন্য কাজে ব্যবহার করা বা দীর্ঘদিন অব্যবস্থাপনায় পড়ে থাকা ঠেকাতেও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

দেশজুড়ে খেলার মাঠ বাড়ানোর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় খুঁজে বের করা এবং তৃণমূল থেকে ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে ঘোষণার পাশাপাশি মাঠগুলো বাস্তবে কত দ্রুত তৈরি হচ্ছে, সেটিই হবে উদ্যোগটির অগ্রগতি পরিমাপের মূল বিষয়।