চট্টগ্রাম বন্দরে DP World চুক্তির প্রতিবাদে শ্রমিকদের গণঅনশন

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের জন্য দেওয়ার চুক্তি বাতিলের দাবিতে গণঅনশন করেছেন বন্দর শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। সোমবার (১২ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের সামনে এ কর্মসূচি শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, চুক্তির শর্ত সম্পর্কে স্বচ্ছতা নেই এবং এতে কর্মরত শ্রমিকদের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এবং জাতীয়তাবাদী বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক দলের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে শতাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন। চুক্তি বাতিল, কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং চুক্তির আর্থিক ও পরিচালনাগত শর্ত প্রকাশের দাবি জানান তাঁরা। দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসূচিটি ওই দিন বিকেল পর্যন্ত চালানোর পরিকল্পনা ছিল।

৮ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয় ১৫ বছরের চুক্তি

গত ৮ অক্টোবর ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটোরিয়ামে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান ইসা কাজিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

চুক্তি অনুযায়ী, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ও এর অতিরিক্ত কনটেইনার ইয়ার্ডের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। তবে টার্মিনালের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। প্রতিষ্ঠানটির ঘোষণায় বলা হয়েছে, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত পরিচালনব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে টার্মিনালের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং পণ্য পরিবহন আরও দক্ষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

শ্রমিকদের আপত্তি কোথায়

আন্দোলনকারীদের প্রধান আপত্তি চুক্তির শর্ত প্রকাশ না করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে শ্রমিক ও বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা না হওয়া। তাঁদের দাবি, টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে বর্তমান শ্রমিক-কর্মচারীদের দায়িত্ব, কর্মপরিধি ও চাকরির নিশ্চয়তা কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চুক্তি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ চেয়েও তাঁরা উদ্যোগ পাননি। এ কারণে অনশনে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ এখনো রয়েছে বলেও তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

সংগ্রাম পরিষদের আরেক সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, চুক্তির বিস্তারিত বিষয় সম্পর্কে শ্রমিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও পর্যাপ্ত তথ্য জানেন না। আন্দোলনকারীরা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ এবং সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।

চুক্তির পক্ষে কর্তৃপক্ষের যুক্তি

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রকাশিত যৌথ উদ্যোগসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের এই অংশীদারত্বের লক্ষ্য টার্মিনালের পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো, পণ্য ওঠানো-নামানোর প্রক্রিয়া উন্নত করা এবং বাংলাদেশের বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা। ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার ও কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামান চুক্তি স্বাক্ষরের পর দেওয়া বক্তব্যে বলেন, এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য ও সরবরাহ অবকাঠামো শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান ইসা কাজিমও আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম উন্নত করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন।

তবে শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা ও চুক্তির শর্ত প্রকাশ নিয়ে তাঁদের নির্দিষ্ট উদ্বেগের জবাবে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত, পৃথক সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে কর্মীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় কী ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

অনশন থেকে পরবর্তী কর্মসূচির ঘোষণা

১২ অক্টোবরের গণঅনশনের আগে ৮ অক্টোবর চুক্তি স্বাক্ষরের দিনও বন্দর এলাকায় বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। ওই দিন তাঁরা সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য তিন দিনের সময়সীমা বেঁধে দেন এবং দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন জোরদারের হুঁশিয়ারি দেন।

কালবেলার ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনকারীরা দাবি পূরণ না হলে ১৯ অক্টোবর আবারও অনশন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশ, স্বাধীন আর্থিক ও কারিগরি মূল্যায়ন এবং দেশের বন্দর পরিচালনায় নিজস্ব সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

দেশের বাণিজ্যে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই টার্মিনাল

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। এ বন্দরের কার্যক্রমে পরিবর্তন এলে পণ্য পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা ও ব্যবসায়িক ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর পরিচালনা নিয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বচ্ছতা, শ্রমিকদের অধিকার এবং জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় রাখা জরুরি।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির ফলে বন্দরের কার্যকারিতা কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধরন ও নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের ওপর। একই সঙ্গে কর্মরত শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা এবং তাঁদের সঙ্গে কার্যকর আলোচনার ব্যবস্থা কতটা নিশ্চিত করা হয়, সেটিও এই চুক্তি ঘিরে বিরোধ নিরসনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এখন সরকারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ, চুক্তির শর্ত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ এবং শ্রমিকদের উদ্বেগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের দিকে নজর রয়েছে। এসব প্রশ্নের সমাধান না হলে বন্দরকেন্দ্রিক আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে থাকবে।