দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে শুরু হয়েছে কক্সবাজার থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ৮৩৬ জন পর্যটক নিয়ে মৌসুমের প্রথম জাহাজ এমভি বার আউলিয়া সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে জাহাজটি ছেড়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে ২০২৬-২৭ পর্যটন মৌসুমে দ্বীপটিতে পর্যটকদের যাতায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াত শুরুর কথা ছিল। কিন্তু জাহাজ চলাচলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন, রুট পারমিট, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় নির্ধারিত দিনে যাত্রা শুরু করা সম্ভব হয়নি। জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ অধিদপ্তর ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনুমোদন পেলেও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের চূড়ান্ত সম্মতি পেতে অপেক্ষা করতে হয়। এ কারণে পাঁচ দিন পিছিয়ে যায় পর্যটক পরিবহন।

সি ক্রুজ অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানিয়েছেন, এ মৌসুমে তিনটি জাহাজকে সেন্ট মার্টিন রুটে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ও এমভি টেকনাফ। তিনটি জাহাজের সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে বার আউলিয়া ৮৫০, কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ৭৩২ এবং টেকনাফ ৭১৬ জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে। প্রথম দিন শুধু বার আউলিয়া যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। অন্য দুটি জাহাজও পর্যায়ক্রমে চলাচল শুরু করার কথা রয়েছে।

এবারের পর্যটন মৌসুম চলবে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সংশোধিত নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকেরা সেন্ট মার্টিনে ভ্রমণের পাশাপাশি রাতযাপনও করতে পারবেন। এর আগে নভেম্বর মাসে দিনে গিয়ে একই দিনে ফিরে আসার নিয়ম নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। পরে ২৭ অক্টোবর সংশোধিত নির্দেশনা জারি করে পুরো পর্যটন মৌসুমে রাতযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। ফলে দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁগুলোও পর্যটকদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিয়েছে।

তবে পর্যটকদের যাতায়াত ও অবস্থানের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। ভ্রমণের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনুমোদিত জাহাজ ছাড়া অন্য কোনো নৌযানে পর্যটকদের দ্বীপে যাতায়াতের সুযোগ নেই। জাহাজ ছাড়ার নির্ধারিত স্থান কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট।

দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আগের নিষেধাজ্ঞাগুলোও বহাল রয়েছে। রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টি আয়োজন করা যাবে না। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা কেনাবেচা নিষিদ্ধ। প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। সৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইক চালানোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পর্যটকদের একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহার থেকে বিরত থাকার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে সেন্ট মার্টিনের পর্যটন কার্যক্রম সীমিত রাখা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা চলছিল। অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সুপেয় পানির সংকট এবং প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতি দ্বীপটির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। এ কারণে পর্যটন কার্যক্রম চালুর পাশাপাশি দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সরকারি বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রথম জাহাজের যাত্রা শুরুর মধ্য দিয়ে পর্যটক, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দ্বীপের বাসিন্দাদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। তবে পর্যটন কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণের নিয়ম কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, সেটিই এবারের মৌসুমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।