ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে অটোরিকশা ও ধীরগতির যান। ব্যস্ত এই মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের পাশাপাশি এসব যান চলাচল করায় তৈরি হচ্ছে সংঘর্ষের ঝুঁকি। কোথাও কোথাও ভুল লেনে চলাচল ও হঠাৎ লেন পরিবর্তনের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নোটিশে মহাসড়কে থ্রি-হুইলার, অটোরিকশা, অটোটেম্পু ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। জাতীয় ভূমি পরিবহন নীতিতেও যান্ত্রিক যানবাহনের জন্য নির্মিত জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিরাপদ নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তারপরও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০২৬ সালের মার্চে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মহাসড়কে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের কথা উঠে আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, এসব যান হঠাৎ লেন পরিবর্তন করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং যানজটও বাড়ছে।

হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছিল, অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে চালকদের সঙ্গে পুলিশের বিরোধ তৈরি হচ্ছে। মিয়াবাজার হাইওয়ে থানার ইনচার্জ শাহাব উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় পুলিশ সদস্যদের লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটেছে। তিনি অভিযান চালানোর প্রস্তুতির কথা জানান।

মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচলের ঝুঁকি কেবল যানজটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর আগেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অটোরিকশা ও দ্রুতগতির যানবাহনের সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ সালে সীতাকুণ্ডে ভুল পথে চলা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে বাসের সংঘর্ষে চালক নিহত ও তিন যাত্রী আহত হন বলে হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছিল।

২০২৩ সালের নভেম্বরেও মিরসরাইয়ের সুফিয়া রোড এলাকায় দ্রুতগতির একটি কাভার্ড ভ্যান দুটি ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যান ও একটি পিকআপে ধাক্কা দিলে প্রাণহানি ঘটে। পুলিশ জানিয়েছিল, দুর্ঘটনার সময় রিকশাভ্যানগুলো মহাসড়কের পাশে ছিল এবং কাভার্ড ভ্যানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেগুলোতে আঘাত করে।

চলতি বছরও মহাসড়কটির ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির উদাহরণ পাওয়া গেছে। জানুয়ারি ২০২৬-এ মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া এলাকায় একটি পার্ক করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে পেছন থেকে ট্রাক ধাক্কা দিলে দুজন নিহত ও তিনজন আহত হন। হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতার কথা জানান।

বিশেষজ্ঞ মতামত না এনে সরাসরি সড়কের বাস্তব চিত্র বিবেচনা করলে, ধীরগতির যান ও দ্রুতগতির যান একই জায়গায় চলাচল করাই বড় ঝুঁকির একটি দিক। একটি যানকে পাশ কাটাতে গিয়ে দ্রুতগতির বাস বা ট্রাককে হঠাৎ গতি কমাতে কিংবা লেন পরিবর্তন করতে হলে পেছনের ও পাশের যানবাহনের জন্যও তৈরি হতে পারে বিপজ্জনক পরিস্থিতি।

ভুল লেনে চলাচল করলে ঝুঁকি আরও বাড়ে। বিপরীতমুখী যানবাহনের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনার পাশাপাশি চালকদের হঠাৎ ব্রেক বা দিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে একটি ছোট ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অটোরিকশা চলাচল নিয়ে স্থানীয় বাস্তবতার আরেকটি দিকও সামনে এসেছে। চৌদ্দগ্রামের চালকদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, স্থানীয় সড়কে আয় কম হওয়ায় বাড়তি আয়ের আশায় তারা মহাসড়কে উঠছেন। তবে জীবিকার এই বাস্তবতা থাকলেও নিষিদ্ধ যানবাহনের কারণে মহাসড়কের নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু এককালীন অভিযান নয়, নিয়মিত নজরদারি এবং নিষেধাজ্ঞার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় সড়ক ও বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে ধীরগতির যানবাহনকে মহাসড়রের মূল লেন থেকে দূরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অন্যতম প্রধান যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন করিডর। তাই দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ভ্যান, অটোরিকশা ও অন্যান্য ধীরগতির যান যাতে একই লেনে অবাধে চলতে না পারে, সে বিষয়ে নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর অন্যতম উপায়।