রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলার ১২৩ উপজেলায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে সরকার। ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প’ নামের এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে (ডিপিএইচই)। তবে ২৫ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত হওয়ায় প্রকল্পটির অনুমোদন প্রক্রিয়া পিছিয়ে গেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব রয়েছে। এর পুরো ব্যয় সরকারি তহবিল থেকে মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের জন্য নিরাপদ পানির সুযোগ বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নত করা।
কী কী সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে
প্রকল্পের আওতায় নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য ৫৯ হাজার ৭৭৮টি উন্নত দুই গর্তবিশিষ্ট স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ৪ হাজার ৩৯৪টি কমিউনিটিভিত্তিক পানি সরবরাহ ইউনিট, ২২ হাজার ১৭৬টি অগভীর নলকূপ এবং ৪ হাজার ৮২৯টি গভীর নলকূপ স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া সাবমার্সিবল পাম্প ও জলাধারসহ ৫ হাজার ৩৯৯টি অগভীর নলকূপ এবং ১ হাজার ১১৩টি গভীর নলকূপ স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য ১২৫টি শৌচাগার, ১ হাজার ৬৮টি রিংওয়েল, ১ হাজার ৭৯৭টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা এবং ১৬টি পুকুরে বালু পরিশোধনব্যবস্থা নির্মাণের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
কেন বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দেখা দেয়। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বারবার খরা এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বর্ষাকালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও শুষ্ক মৌসুমে অনেক এলাকায় পানীয় জল ও সেচের পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এ চিহ্নিত ছয়টি পানিসংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চল দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কমে যাওয়া এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এ অঞ্চলে নিরাপদ পানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে চাপ বাড়ছে।
স্যানিটেশন সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, বরেন্দ্র অঞ্চলের মাত্র ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা পান। ফলে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও নিরাপদ পানি সরবরাহব্যবস্থার ঘাটতি জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে বিশেষ করে নিম্নআয়ের পরিবার এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি কমানো এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা মিলতে পারে।
একনেক বৈঠক স্থগিত, অনুমোদনের অপেক্ষায় প্রকল্প
প্রকল্পটি ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা একনেক সভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত করা হয়। ওই সভায় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। বৈঠক স্থগিত হওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলের নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্পসহ এসব প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়াও পিছিয়ে গেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয় ৫০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় এটি বাস্তবায়নের আগে একনেকের অনুমোদন প্রয়োজন। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারির সভায় নির্ধারিত শর্ত পূরণের ভিত্তিতে এটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল। তবে মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত অনুমোদনের বিকল্প নয়।
এখন প্রকল্পটির পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করছে একনেকের নতুন সভার তারিখ এবং সেখানে প্রস্তাবটি বিবেচনার ওপর। অনুমোদন পাওয়া গেলে নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন অবকাঠামো সম্প্রসারণের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

