প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিবারের আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ায় এবং বৈদেশিক লেনদেন সামলাতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
তবে নতুন অর্থবছরেও রেমিট্যান্সের প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৬ থেকে ২০২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসে ২ দশমিক ৮৫৮৬৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এসেছিল ২ দশমিক ৪৭৭৮৭ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ের রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড
২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরের রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মার্চ ২০২৬ এ এক মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ৩ দশমিক ৭৫২ বিলিয়ন ডলার, যা ওই অর্থবছরের সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাহ। মে মাসেও এসেছে ৩ দশমিক ৪৪৩ বিলিয়ন ডলার।
তবে জুনে রেমিট্যান্স কিছুটা কমে ২ দশমিক ৮১৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এরপর জুলাইয়ে আবার ২ দশমিক ৮৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের শুরুতেও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ শক্তিশালী রয়েছে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে বড় ভূমিকা
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব অনেক। প্রবাসী আয় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ায়, যা আমদানি ব্যয় ও অন্যান্য বৈদেশিক পরিশোধ মেটাতে সহায়তা করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই শেষে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। জুন শেষে মোট রিজার্ভ ছিল ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে। একই প্রতিবেদনে জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিনে রেমিট্যান্স আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
পরিবারের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের প্রভাব
রেমিট্যান্সের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রবাসী কর্মীদের পরিবারের ওপর। বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ দিয়ে পরিবারের সদস্যরা খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও অন্যান্য দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটান।
অনেক পরিবার আবার রেমিট্যান্সের অর্থ সঞ্চয় কিংবা ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। ফলে প্রবাসী আয় শুধু একটি পরিবারের আয় বাড়ায় না, স্থানীয় পর্যায়েও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় রেমিট্যান্সের অর্থ স্থানীয় বাজারে ব্যয় হওয়ায় দোকানপাট, পরিবহন, নির্মাণ ও বিভিন্ন সেবা খাতে এর পরোক্ষ প্রভাব তৈরি হয়।
বৈদেশিক লেনদেনে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব
বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ। রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয় এবং বিদেশি ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি প্রবাসী আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের একটি বড় উৎস।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রথম ১৫ দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ রিজার্ভ বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে।
কেন রেমিট্যান্স বাড়ছে
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। প্রবাসীদের জন্য আনুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানো সহজ হওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজার পরিস্থিতিও এর সঙ্গে যুক্ত।
তবে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি সবসময় একই থাকবে এমন নিশ্চয়তা নেই। জুলাইয়ে প্রবাহ ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও এটি টানা দ্বিতীয় মাস ছিল যখন মাসিক রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে ছিল।
অর্থাৎ সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও প্রতি মাসের প্রবাহে ওঠানামা রয়েছে।
প্রবাসী কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স
রেমিট্যান্সের মূল উৎস বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের আয়। তাই নতুন শ্রমবাজার তৈরি, দক্ষ কর্মী পাঠানো এবং তুলনামূলক বেশি বেতনের কাজের সুযোগ বাড়ানো রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে প্রবাসী কর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর সুযোগ এবং দ্রুত ও কম খরচে দেশে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
রেমিট্যান্স শুধু অর্থ নয়
প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে একাধিকভাবে কাজ করে। একদিকে এটি পরিবারের আয় বাড়ায়, অন্যদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ ও রিজার্ভকে সহায়তা করে।
২০২৫ থেকে ২০২৬ অর্থবছরে ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স এবং ২০২৬ থেকে ২০২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলারের প্রবাহ দেখাচ্ছে, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব এখনও অনেক বেশি।
তবে দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স বাড়াতে শুধু বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। দক্ষ কর্মী তৈরি, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর সুযোগ আরও সহজ করাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তাই প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান শুধু রেমিট্যান্সের পরিমাণ দিয়ে মাপা যায় না। তাঁদের শ্রম ও বিদেশে অর্জিত আয় দেশের পরিবার, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।



